গল্পঃ বেলিফুল
পর্ব – ১
লেখা: সুমি আক্তার
বাসর ঘরে ঢুকে বুঝতে পারলাম, যার সাথে এতদিন প্রেম করেছিলাম—সে নয় আমার পাশে বসে থাকা মানুষটা। মুখের আদল এক, হাসিটা পর্যন্ত একই রকম, তবু কেমন যেনো অচেনা।
—“মানে? আপনি বলছেন, আপনি তিন্নি নন?”
—“আমি আদিরা। তিন্নি আমার যমজ বোন।”
—“তিন্নির যমজ বোন! আমি তো কোনোদিন কিছু শুনিনি ওর মুখে। ও কোথায়?”
—“সে... সে বিয়ের আগের রাতে কাউকে নিয়ে পালিয়ে গেছে।”
—“না... না, ও তো আমাকে ভালোবাসতো। অন্য কারো সাথে পালাবে কেনো?”
—“সেটা আমি জানি না। তবে বিয়ে হয়েছে আমার সাথে, আপুর সাথে নয়।”
আদিরা ফোন এগিয়ে দিলো আমার দিকে।
ছবির পর ছবি—একসাথে দাঁড়িয়ে দুই বোন। একসাথে বেড়ানো, জন্মদিনের কেক কাটা, শৈশবের স্মৃতি।
চোখে জল এসে গেলো।
একটা ছবিতে স্পষ্ট দেখা গেলো, আদিরার ঠোঁটের নিচে কোনো তিল নেই। অথচ তিন্নির ছিলো, সেই তিল আমি কতবার ছুঁয়ে বলেছি—"তুইই আমার চিহ্নধারী ভালোবাসা।"
হাসি পায় নিজের উপর।
চার বছর ধরে প্রেম, দিনের পর দিন স্বপ্ন বোনা, অথচ শেষ দৃশ্যটা এভাবে হবে ভাবিনি। তিন্নি পালিয়ে যাবে, আর আমি বিয়ে করবো তার যমজ বোনকে? ভাগ্যের এ কেমন নির্মম পরিহাস!
তিন্নিকে বিয়ে করার কত স্বপ্ন ছিলো…
তিন্নির বদলে আজ পাশে বসে আছে আদিরা। চেহারার মিল থাকলেও—মন, অভ্যেস, অনুভব—সব কিছুই আলাদা।
—“আপনি কিছু ভাবছেন?”
আদিরার কণ্ঠে নরম পরশ।
—“হ্যাঁ, ভাবছিলাম।”
—“কি ভাবছেন?”
—“আপনি রাজি ছিলেন এই বিয়েতে?”
—“হ্যাঁ।”
—“আপনার কোনো বয়ফ্রেন্ড ছিলো?”
—“ছিলো…” (এক মুহূর্ত চুপ) “সে তো অনেক আগেই অন্য কাউকে বিয়ে করে নিয়েছে।”
তারপর হঠাৎ হেসে বলে,
—“আসলে কেউ ছিলো না। আমেরিকায় থাকতাম, ব্যস্ত ছিলাম নিজের লক্ষ্য নিয়ে।”
—“মেকআপ করেননি?”
—“সময় ছিলো না। আর আমার নিজের রঙ, নিজের চেহারা নিয়ে গর্ব আছে। কসমেটিক দিয়ে ঢাকতে চাই না নিজের সত্যি রূপ।”
তার কথা শুনে আমি চুপচাপ।
মেয়েটা স্মার্ট, চিন্তাশীল, আত্মবিশ্বাসী।
হঠাৎ বলে বসলো,
—“একটা কথা বলি?”
—“বলুন।”
—“আপু পালিয়েছে বলে আপনি আমাকে বলবেন না, 'তুমি বিছানায় শুয়ে ঘুমাও, আমি সোফায় শুই'। আমি আপনার স্ত্রী। শারীরিক সম্পর্কের দরকার নেই, সময় নিন। তবে ভালোবাসতে মানা করবেন না।”
আমি কিছু বললাম না, শুধু বললাম—
—“আচ্ছা।”
তিন্নি চলে গেছে। তার প্রতিশ্রুতি, তার ভালোবাসা আমার জীবনে এক করুণ অধ্যায় হয়ে গেছে। আর এই মেয়েটা, আদিরা—সে আমার স্ত্রী। তার ওপর আমার যেমন অধিকার আছে, তেমন আমারও দায়িত্ব আছে তাকে ভালোবাসার।
—“আপনারা কিভাবে প্রেমে পড়েছিলেন? বলবেন?”
আদিরা কৌতুহল নিয়ে তাকালো।
আমি শুরু করলাম...
—“লাস্ট ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষা ছিলো। সিট পড়েছিলো তিন্নির পাশেই।
তিন্নিকে দেখে আমি লিখতেই পারিনি কিছু। পুরো তিন ঘণ্টা তাকিয়ে ছিলাম শুধু।
পরীক্ষা শেষে খোঁজ করলাম, প্রোপোজ করলাম—না করলো।
তারপর দিন গুনে পেছনে ঘুরলাম।
একদিন রাস্তায় সে নীল শাড়ি পরে রিকশায় ছিলো।
আমি বেলিফুলের মালা কিনতে গিয়ে এক্সিডেন্ট করলাম।
হাতে পায়ে কেটে গিয়েছিলো। মালাটা রক্তে রাঙা হয়ে লাল হয়ে গিয়েছিলো। সেই রক্তমাখা বেলিফুল আজও রেখে দিয়েছি যত্নে। আজ তাকে দেওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু সে তো নেই।
কথাগুলো বলতে বলতে আমার চোখে জল চলে আসে।
আদিরাও কেঁদে ফেললো।
—“বেলিফুলের মালাটা আমাকে দেবেন?”
আমি বিস্মিত হয়ে তাকালাম তার দিকে।
—“কেনো?”
(চলবে...)
