মাঝরাতে ফোনে কথা বলা শেষ করে আহনাফ বারান্দা থেকে রুমে ঢুকতেই চমকে ওঠলো। সাইমা গালে হাত দিয়ে স্থির হয়ে সোফায় বসে আছে। ডিম লাইটের আলোতে বুঝা যাচ্ছে না, সে ঠিক কোনদিকে তাকিয়ে আছে। আহনাফের বুকটা কেঁপে ওঠলো। সাইমা কি কিছু শুনতে পেয়েছে? সে কি তাকে সন্দেহ করে? সব কি জেনে গেছে? নানান প্রশ্ন মাথায় উঁকি দিতেই আহনাফ দিশেহারা হয়ে গেল। কাঁপা কন্ঠে ডাকল,— “সাইমা!”
কোনো উত্তর নেই।
আহনাফ আরেকটু কাছে গিয়ে উচ্চস্বরে ডাকলো,
—“সাইমা!”
: “হু”। ধরফর করে সাইমা ওঠে দাঁড়ালো।
: “এতো রাতে জেগে আছো যে?”
সাইমা নিশ্চুপ। ভাবলেশহীন পলকে তাকিয়ে রইলো আহনাফের দিকে। আহনাফের অস্থিরতা বেড়েই চলেছে। বুকের ভেতরে ছটফটানি সে চেপে রাখতে পারছে না। খানিকটা ক্রোধ মিশ্রিত কন্ঠে বলল,— “সাইমা! একটা প্রশ্ন করেছি, চুপ করে থাকবে না। এতো রাতে জেগে থাকার কারণ কী? তোমার শরীর খারাপ। নিজের দিকে কেন খেয়াল নেই তোমার?”
সাইমা নিজেকে সামলে নিয়ে জবাব দিলো,— “ঘুম আসছিল না। কেমন জানি হাঁসফাঁস লাগছিল। তাই একটু ওঠেছিলাম। আচ্ছা, ঘুমুচ্ছি।”
এ বলে সাইমা বিছানায় শুয়ে পড়ল। আহনাফের কপালে বিরক্তির চিহ্ন। গম্ভীরস্বরে বলল, — “তোমার নিজের দিকে মনোযোগ দিতে হবে সাইমা! তুমি এখন একা নও!”
সাইমা মৃদু হাসল। “ঠিক আছে, মনে থাকবে।”
আহনাফ দ্বিধাদ্বন্দে ভুগছে। সাইমা তো কোনো প্রশ্ন করল না? তবে কি সে কিছুই বুঝে নি? না বুঝার মেয়ে তো সে নয়! কিছু একটা হলেই রীতিমতো জেরার আসর বসিয়ে ফেলে। আজ কী হলো?
আহনাফ পুনরায় বারান্দায় দিকে পা বাড়ালো। সাইমা একবার তাকে আড়চোখে দেখে নিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চেনা-জানা মানুষটা কতো দ্রুত-ই না বদলে যায়!
আহনাফ গ্রিলে হাত রেখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। চোখেমুখে তার দুশ্চিন্তার চাপ। মধ্যরাতের আকাশ কেমন নিস্তব্ধতায় ছুঁয়ে আছে। যেন কোথাও কেউ নেই। নিজেকে কেমন নিঃসঙ্গ মনে হয়। আহনাফের বুক জুড়ে উতাল-পাতাল শব্দ। সময় কতো দ্রুত ফুরায়!
বিয়ের কয়েকদিন পর-ই আহনাফ সাইমার উপর থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। প্রথম প্রথম সে নিজেও এটা টের পায় নি। সাইমাকে কেমন অসহ্য লাগতে শুরু হলো। তার কথাবার্তা, হাসি, ভালোবাসা প্রকাশ কিছুই শুনতে ভালো লাগে না। মাথাটা কেমন ঝিম হয়ে আসতো। বিরক্তিতে ফেটে পড়ত। আহনাফ সেটা বুঝতে দেয় নি। নিজেকে খুব কষ্টে নিয়ন্ত্রণ করেছিল সে। হঠাৎ করে সাইমার প্রতি তীব্র টান, অস্থিরতা হারিয়ে ফেলার কারণটা সে-ও ঠিক বুঝতে পারলো না।
কারো সাথে এ নিয়ে আলাপ করার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আলাপ করতে পারছিল না। সে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিল। বন্ধু-বান্ধব কাউকে বলতেও কেমন জানি দেখায়! উল্টো তাকে দোষারোপ করবে না তো? ভয়, লজ্জা, সংকোচ নিয়েও ব্যাপারটা সে এক বন্ধুর সাথে আলাপ করলো। বন্ধু জানালো, এটা না-কি খুব স্বাভাবিক। শত সাধনার বস্তু বা মানুষটাকে পেয়ে গেলে না-কি আর মন টানে না। যতদিন দূরে থাকবে, ততদিন-ই কেবল মুগ্ধতা ছড়াবে। আর কাছে এলেই হারিয়ে যাবে।
দুই/তিনমাসের মাথায় ঘরে অশান্তি শুরু হলো। আহনাফের মা ও বোনেরা শুরু থেকেই সাইমাকে তেমন একটা পছন্দ করত না। কিন্তু, আহনাফের কারণে তারা এতদিন টুঁ শব্দটিও করে নি। ছোট্ট বিষয় নিয়ে সাইমা ও তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হতেই লাগলো। সাইমা উত্তর দেওয়ার মতো মেয়ে নয়; নিত্যদিন চুপচাপ সে তাদের অকথ্য কথন হজম করে নিলো। কেন? কার জন্য? হয়তো আহনাফের মুখের দিকে তাকিয়ে সমস্ত দোষ নিজের মাথায় চেপে নিতে রাজি সে। দিনশেষে সে আহনাফকে তার পাশে চেয়েছিল, আর কাউকে নয়।
সাইমার জন্য সকালে ঘুমানো একদমই বারণ। যতই অসুস্থতা থাকুক না কেন সবার আগে তাকে ওঠে নাস্তা তৈরী করতে হবে। তারপর থেকে শাশুড়ী একের পর এক কাজ ধরিয়ে দেন। নিঃশ্বাস নেওয়ার সময়টুকুও বুঝি দেন না। দুপুরে ঘন্টা দু'য়েক সময় পায় একান্ত নিজের জন্য। সেই সময়টিতে সাইমা আহনাফের চিন্তায় অস্থির হয়ে ওঠে। ফোনে টুকটাক মেসেজ আদান-প্রদান করে। আহনাফ বেশীরভাগ সময় 'হা- হু' দিয়ে কথা শেষ করে ফেলে। যেন নতুন করে বলার মতো কিছুই নেই। সাইমা অপেক্ষা করে তার ঘরে ফিরার।
দুপুর পেরোতে না পেরোতেই আবারও কাজ। একেকজনের জন্য একেক রকমের নাস্তা বানাতে হবে। সাইমার খাওয়া না খাওয়া নিয়ে কেউ একবারও ভাবে না। বরং, সে না খেলেই যেন ওরা বেশী খুশী। রাতে সবার খাওয়া শেষে সাইমা নিজের জন্য অল্প একটু ঝোল পায়। কোনোদিন আবার সেইটুকুও মিলে না।
কাজ শেষ হয়ে গেলেও ইচ্ছে করে আহনাফ দেরী করে বাড়িতে ফিরে। রোজ রোজ এক অশান্তি দেখতে তার ভালো লাগে না। কিন্তু, ঘরে আসতেই মা তাকে ডেকে পাঠায়। ইচ্ছে করে অনেকক্ষণ ধরে গল্প করেন। প্রথম প্রথম ফিসফিস কণ্ঠে সাইমার নামে নালিশ করতেন। যেমনঃ- সাইমা ওই কাজটা করে নি, সাইমাকে অনেকবার ডেকেও পান নি, একটা কাজ করতে দিলে সুন্দরভাবে করে না। ইত্যাদি।
ধীরে ধীরে আহনাফের সমর্থন তাকে আরো উৎসাহিত করে তোলে। এখন রীতিমতো তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা শুরু করেন।
ছোট বোন আফিয়াও ভাবীর নামে নালিশ শুরু করে দেয়। আহনাফের মাথা ধরে যায়। রুমে ঢুকেই সাইমাকে হাজারটা কথা শুনিয়ে জর্জড়িত করে ফেলে। সাইমা নীরবে সহ্য করে নেয়। কোনোদিনও সে প্রতিবাদ করে নি। আহনাফের কথা হলো, নারীদের ব্যাপার তোমরা নারীরাই দেখো। যদিও মায়ের কথায় সে সায় দেয়, কিন্তু কোনোদিন জানতে ইচ্ছে করে নি আসলেও কি সাইমা অপরাধী?
আহনাফ এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। সাইমার উপরে তো তার নিজেরও মন নেই। সাইমার মধ্যে ভালো লাগার মতো কিছুই খুঁজে পায় না। কীভাবে ভালো লাগবে? যে চঞ্চলতা দেখে সে মুগ্ধ হয়েছিল, এখন সেই চঞ্চলতা সাইমার মধ্যে নেই। দিনদিন কেমন জানি মেয়েটা নিষ্প্রভ হয়ে যাচ্ছে। এমনটা তো চায় নি সে? জীবনের রঙ এতো দ্রুত শুকিয়ে গেলে কি চলে? বিরক্তিতে আহনাফের মাথা ধরে যায়। তারপর আবার বছর যেতে না যেতেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে বসে আছে। দিনদিন শরীর ভাঙ্গতে শুরু করেছে।
চোখের নিচে কালি, ফেকাসে মুখ ও ফোলা শরীরটা দেখতে তার ভালো লাগে না। অনাগত সন্তান যেন আহনাফের সমস্ত শান্তি, স্বস্তি কেঁড়ে নিয়েছে।
কই একটু স্ত্রী নিয়ে ঘুরাঘুরি করবে, নিজেদের মতো সময় কাটাবে, তা না উল্টো আরো হাজারটা দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ঘুরছে। নিয়মিত চেকাপ, এটা কিনো, ওটা খাওয়াও পাগল হওয়ার উপক্রম।
আহনাফের ঘোর কাটলো ফোনে একটি মেসেজের শব্দ আসতেই। মূহুর্তেই তার মুখে ফুটে ওঠলো হাসি। সে তার সম্পূর্ণ মনোযোগ ফোনের মধ্যে দিয়ে চেয়ারে বসে পড়ল। যেন তার পৃথিবী এখন সেই মেসেজের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
চলবে…
সূচনা পর্বঃ-
ভাঙ্গা_ভরসার_গাঁথুনি
